বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১২ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ – ১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৫০) ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তিনি মূলত উপন্যাস ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। পথের পাঁচালী  অপরাজিত তাঁর সবচেয়ে বেশি পরিচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আরণ্যকআদর্শ হিন্দু হোটেলইছামতী  অশনি সংকেত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের পাশাপাশি বিভূতিভূষণ প্রায় ২০টি গল্পগ্রন্থ, কয়েকটি কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ভ্রমণকাহিনি এবং দিনলিপিও রচনা করেন। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। ১৯৫১ সালে ইছামতী উপন্যাসের জন্য বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার রবীন্দ্র পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন।

জন্ম পরিবার

বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়ামুরাতিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বনগাঁ নিকট বারাকপুর গ্রামে। তার পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত। পাণ্ডিত্য এবং কথকতার জন্য তিনি শাস্ত্রী উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। মাতা মৃণালিনী দেবী। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ সর্বজ্যেষ্ঠ ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

পিতার কাছে বিভূতিভূষণের পড়ালেখার পাঠ শুরু হয়। এরপর নিজ গ্রাম অন্য গ্রামের কয়েকটি পাঠশালায় পড়াশোনার পরবনগ্রাম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়েভর্তি হন। সেখানে তিনি অবৈতনিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় পিতা মারা যান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স এবং ১৯১৬ সালে কলকাতা রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ) থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৮ সালে একই কলেজ থেকে বি. পরীক্ষায়ও ডিস্টিংশনসহ পাশ করেন। এরপর তিনি এমএ আইন বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে দেন ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে।

বিবাহ

১৯১৯ সালে হুগলী জেলার জাঙ্গীপাড়ায় দ্বারকানাথ হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ানোর সময় বসিরহাটের মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা গৌরী দেবীর সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের এক বছর পরই গৌরী দেবী মারা যান। স্ত্রীর শোকে তিনি কিছুদিন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন। পরে ১৩৪৭ সালের ১৭ অগ্রহায়ণ (ইংরেজি ডিসেম্বর, ১৯৪০) তারিখে ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে রমা দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের সাত বছর পর একমাত্র সন্তান তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (ডাকনাম বাবলু) জন্মগ্রহণ করেন।

 

 

কর্মজীবন

শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। এসময় কিছুদিন গোরক্ষিণী সভার প্রচারক হিসেবে বাংলাত্রিপুরা  আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। পরে খেলাৎচন্দ্র ঘোষের বাড়িতে সেক্রেটারি, গৃহশিক্ষক এবং তার এস্টেটের ভাগলপুর সার্কেলের সহকারী ম্যানেজারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন আবার ধর্মতলার খেলাৎচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর যোগ দেন বনগাঁর নিকট গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশন স্কুলে। এই স্কুলেই তিনি আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন। এই মহান কথাসাহিত্যিক ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর তারিখে বিহারের (বর্তমানে ঝাড়খন্ডঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার বাড়িটির নাম স্ত্রীর নামেগৌরীকুঞ্জরেখেছিলেন। সামনের রাস্তাটি অপুর পথ হিসেবে পরিচিত।

 

 

সাহিত্যকর্ম

১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩২৮ বঙ্গাব্দপ্রবাসী পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় উপেক্ষিতা নামক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। ভাগলপুরে কাজ করার সময় ১৯২৫ সালে তিনি পথের পাঁচালী রচনা শুরু করেন। এই বই লেখার কাজ শেষ হয় ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে। এটি বিভূতিভূষণের প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা। এর মাধ্যমে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর অপরাজিত রচনা করেন যা পথের পাঁচালীরই পরবর্তী অংশ। উভয় উপন্যাসেই তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালী উপন্যাসের কাহিনীকে চলচ্চিত্রে রূপদানের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা করেছিলেন। এই সিনেমাটির নামও ছিল পথের পাঁচালী (চলচ্চিত্র) এই চলচ্চিত্রটি দেশীবিদেশী প্রচুর পুরস্কার  সম্মাননা লাভ করেছিল। এরপর অপরাজিত এবং অশনি সংকেত উপন্যাস দুটি নিয়েও সত্যজিৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এর সবগুলোই বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেছিল। পথের পাঁচালী উপন্যাসটি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা এবং ইংরেজি ফরাসি সহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিভূতিভূষণের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্পগ্রন্থ হল: মেঘমল্লার, মৌরীফুল, যাত্রাবদল। তার লেখা চাঁদের পাহাড় একটি অনবদ্য ্যাডভেঞ্চার কাহিনী, যার পটভূমি আফ্রিকা। চাঁদের পাহাড় কিশোর উপন্যাসটিকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।

পুরস্কার সম্মাননা

  • রবীন্দ্র পুরস্কার – ১৯৫১ (মরণোত্তর), ইছামতী উপন্যাসের জন্য।
  • পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার (লেখকের জন্মস্থান) পারমাদান বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নাম লেখকের সম্মানার্থে রাখা হয়েছেবিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

গ্রন্থতালিকা

উপন্যাস

  • পথের পাঁচালি (১৯২৯)
  • অপরাজিত (১ম ২য় খণ্ড, ১৯৩২)
  • দৃষ্টিপ্রদীপ (১৯৩৫)
  • আরণ্যক (১৯৩৯)
  • আদর্শ হিন্দু হোটেল (১৯৪০)
  • বিপিনের সংসার (১৯৪১)
  • দুই বাড়ি (১৯৪১)
  • অনুবর্তন (১৯৪২)
  • দেবযান (১৯৪৪)
  • কেদার রাজা (১৯৪৫)
  • অথৈজল (১৯৪৭)
  • ইছামতি (১৯৫০)
  • অশনি সংকেত (অসমাপ্ত, বঙ্গাব্দ ১৩৬৬)
  • দম্পতি (১৯৫২)

গল্পসংকলন

  • মেঘমল্লার (১৯৩১)
  • মৌরীফুল (১৯৩২)
  • যাত্রাবাদল (১৯৩৪)
  • জন্ম মৃত্যু (১৯৩৭)
  • কিন্নর দল (১৯৩৮)
  • বেণীগির ফুলবাড়ি (১৯৪১)
  • নবাগত (১৯৪৪)
  • তালনবমী (১৯৪৪)
  • উপলখন্ড (১৯৪৫)
  • বিধুমাস্টার (১৯৪৫)
  • ক্ষণভঙ্গুর (১৯৪৫)
  • অসাধারণ (১৯৪৬)
  • মুখোশ মুখশ্রী (১৯৪৭)
  • আচার্য কৃপালিনী কলোনি (১৯৪৮; ১৯৫৯ সালেনীলগঞ্জের ফালমন সাহেবনামে প্রকাশিত)
  • জ্যোতিরিঙ্গণ (১৯৪৯)
  • কুশলপাহাড়ী (১৯৫০)
  • রূপ হলুদ (১৯৫৭,মৃত্যুর পর প্রকাশিত)
  • অনুসন্ধান (১৯৬০,বঙ্গাব্দ ১৩৬৬, মৃত্যুর পর প্রকাশিত)
  • ছায়াছবি (১৯৬০,বঙ্গাব্দ ১৩৬৬, মৃত্যুর পর প্রকাশিত)
  • সুলোচনা (১৯৬৩)

কিশোরপাঠ্য

  • চাঁদের পাহাড় (১৯৩৮)
  • আইভ্যানহো (সংক্ষেপানুবাদ, ১৯৩৮)
  • মরণের ডঙ্কা বাজে (১৯৪০)
  • মিসমিদের কবচ (১৯৪২)
  • হীরা মাণিক জ্বলে (১৯৪৬)
  • সুন্দরবনের সাত বৎসর (ভুবনমোহন রায়ের সহযোগিতায়, ১৯৫২)

ভ্রমণকাহিনী দিনলিপি

  • অভিযাত্রিক (১৯৪০)
  • স্মৃতির রেখা (১৯৪১)
  • তৃণাঙ্কুর (১৯৪৩)
  • ঊর্মিমুখর (১৯৪৪)
  • বনে পাহাড়ে (১৯৪৫)
  • উৎকর্ণ (১৯৪৬)
  • হে অরণ্য কথা কও (১৯৪৮)

অন্যান্য

  • বিচিত্র জগত (১৯৩৭)
  • টমাস বাটার আত্মজীবনী (১৯৪৩)
  • আমার লেখা (বঙ্গাব্দ ১৩৬৮)
  • প্রবন্ধাবলী
  • পত্রাবলী
  • দিনের পরে দিন

মৃত্যু

অধুনা ঝাড়খন্ডের ঘাটশিলাতে,) পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৫০ (১৭ই কার্তিক ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ,বুধবার) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। পরদিন দুপুরে সুবর্ণরেখা নদীর ওপরেপঞ্চপাণ্ডব ঘাট‘- তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

 

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম

১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪
মুরাতিপুর গ্রামউত্তর চব্বিশ পরগণা জেলাবাংলা প্রদেশ(এখন পশ্চিমবঙ্গ), ভারত

মৃত্যু

নভেম্বর ১৯৫০ (বয়স ৫৬)
ঘাটশিলাবিহার (এখন ঝাড়খণ্ড), ভারত

পেশা

লেখক

জাতীয়তা

ভারতীয়

নাগরিকত্ব

ভারত

সময়কাল

১৯২৯৫০

ধরন

উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণসাহিত্য, দিনলিপি

উল্লেখযোগ্য রচনাবলি

পথের পাঁচালীঅপরাজিতআরণ্যকআদর্শ হিন্দু হোটেলইছামতীঅশনি সংকেতমেঘমল্লারতালনবমীচাঁদের পাহাড়দৃষ্টিপ্রদীপ,দেবযান

উল্লেখযোগ্য পুরস্কার

রবীন্দ্র পুরস্কার (মরণোত্তর, ১৯৫১)

দাম্পত্যসঙ্গী

গৌরী দেবী (১৯১৭১৮)
রমা দেবী (১৯৪০৫০)

সন্তান

তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

Bibhutibhushan Bandyopadhyay – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ।

এখানে আছে ২৪টি বই ।
২৪টি বই এর তালিকা নিচে দেয়া হলো :

সূচিপত্র
১.অপুর সংসার সমগ্র ।
২.অশনি সংকেত ।
৩.আহ্বান ।
৪.ইছামতী ।
৫.কিশোর সমগ্র ।
৬.চাঁদের পাহাড় ।
৭.সরস গল্প ।
৮.দেবযান ।
৯.পথ চেয়ে ।
১০.পথের পাঁচালী ।
১১.বিভূতি-রচনাবলী ১ ।
১২.বিভূতি-রচনাবলী ২ ।
১৩.বিভূতি-রচনাবলী ৩ ।
১৪.বিভূতি-রচনাবলী ৪ ।
১৫.বিভূতি-রচনাবলী ৫ ।
১৬.বিভূতি-রচনাবলী ৬ ।
১৭.বিভূতি-রচনাবলী ৭ ।
১৮.বিভূতি-রচনাবলী ৮ ।
১৯.বিভূতি-রচনাবলী ৯ ।
২০.বিভূতি-রচনাবলী ১০ ।
২১.বিভূতি-রচনাবলী ১১ ।
২২.বিভূতি-রচনাবলী ১২ ।
২৩.হে অরণ্য কথা কও ।
২৪.বিভূতিভূষণের অপ্রকাশিত দিনলিপি ।

“এক অ্যাপে সকল বই”
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর অ্যাপটি
ডাউনলোড করুন

error: Content is protected !!