সতীনাথ ভাদুড়ী ।

সতীনাথ ভাদুড়ী (২৭ সেপ্টেম্বর ১৯০৬৩০ মার্চ ১৯৬৫) ছিলেন একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক। তিনি তৎকালীন বিহারের পূর্ণিয়ার ভাট্টাবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ইন্দুভূষণের আদিবাড়ি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে জীবিকাসূত্রে পিতা ইন্দুভূষণ পূর্ণিয়ায় চলে আসেন। সঙ্গত কারণে সতীনাথের স্কুলজীবন শুরু হয় পূর্ণিয়া জেলা স্কুল হতে। ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন্। এরপর পাটনা সায়েন্স কলেজ থেকে আই এসসি পাস করে ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে অর্থনীতিতে স্নাতক হন। বছরেই মাতা রাজবালা দেবীর মৃত্যু ঘটে। এসত্ত্বেও ১৯৩০ সালে অর্থনীতিতে এম পাশ করেন এবং পরের বছরেই পাটনা আইন কলেজ থেকে বি এল পাশ করেন।

কর্ম সাহিত্য জীবন

১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সতীনাথ পিতার সহকর্মীরূপে পূর্ণিয়া কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। এই সময় নানাবিধ সমাজসেবামূলক কাজেও জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বলিপ্রথা মদের দোকানে পিকেটিং আন্দোলন। সাহিত্যচর্চা শুরু হয় এই সময়েই। বাড়ি বাড়ি বই সংগ্রহ করে পূর্ণিয়া গ্রন্থাগার স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে পিতা ইন্দুভূষণের নামে গ্রন্থাগারটির নাম হয় ‘ইন্দুভূষণ সাধারণ পাঠাগার বলা যায় প্রায় তার একক উদ্যমে বাংলা ম্যাগাজিন ক্লাব গঠনসাহিত্যপাঠ, স্মরণশক্তি প্রতিযোগিতা, সাহিত্য আড্ডা প্রভৃতির প্রচলন হয়। এই কাজের সূত্রেই তিনি স্বনামধন্য সাহিত্যিক কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহ সান্নিধ্য লাভ করেন। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক জীবনেরও সূচনা ঘটে। গান্ধীজীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলন তাকে আকৃষ্ট করে এবং গান্ধিবাদী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশের চোখ এড়িয়ে গভীর রাতে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে স্বাধীনতা আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে ঘরে। ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে সতীনাথ ভাদুড়ী প্রথমবারের জন্য কারারুদ্ধ হন।১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তিনি দ্বিতীয়বার কারাবাসকালে জেল ভেঙে পালানোর চেষ্টা করেন ; এর ফলে তাকে ভাগলপুর সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হয়। এই কারাবাসকালীন সময়ই তার ‘জাগরী‘ উপন্যাস রচনার প্রস্তুতিকাল। ১৯৪৪ সালে তিনি তৃতীয়বার কারাবরণ করেন। এই কারাবাসের সময় তার সঙ্গে ছিলেন ফণীশ্বরনাথ রেণুঅনাথবন্ধু বসু ,ফণীগোপাল সেনজয়প্রকাশ নারায়ণশ্রীকৃষ্ণ সিংহঅনুগ্রহনারায়ণ সিংহ প্রমুখ। ১৯৪৫ সালে তার সাড়া জাগানো উপন্যাসজাগরীপ্রকাশিত হয়।চিত্রগুপ্তএই সাহিত্যিক ছদ্মনামে তিনি পরিচিত ছিলেন।

কংগ্রেসপার্টি ত্যাগ

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তিনি কংগ্রেসের একজন সক্রিয়কর্মী ছিলেন এবং পূর্ণিয়া জেলা কংগ্রেসের সম্পাদকের পদে আসীন ছিলেন ; কিন্তু দলের আভ্যন্তরীন কাজকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন।পার্টির দুর্নীতি আর দলাদলি তার অসহ্য বোধ হয়। জনৈক্য পুরনো গ্রামীণ কর্মী তার কাছে কংগ্রেস ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি অকপটে জানিয়েছিলেন যে কংগ্রেসের কাজ ছিলো স্বাধীনতা লাভ করা। সে কাজ হাসিল হয়ে গেছে। এখনরাজকাজছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই।

সম্মান শেষজীবন

কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর সতীনাথ পূর্ণিয়ার কিশোর আর তরুণদের জন্য ব্যায়ামাগার গঠন শনিবারের সাহিত্যবাসর পরিচালনা করতে থাকেন। ১৯৪৯ সালে তিনি বিদেশ যাত্রা করেন। বিদেশে থাকাকালীন সময়েই তিনি তার গ্রন্থজাগরী জন্য বাংলাভাষায় প্রথম রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫০) প্রাপ্তির সংবাদ পান। বিখ্যাত সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণু তার জীবনী মূলক স্মৃতিকথাভাদুড়িজিরচনা করেন, যা হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ।

মৃত্যু

১৯৬৫ সালের ৩০ মার্চ সতীনাথ ভাদুড়ীর প্রয়াণ ঘটে। মাত্র আটান্ন বছর বয়সে কোশীর শাখানদীর শ্মশানঘাটে তার মরদেহ ভস্মীভূত হয়ে মিশে গেল পূর্ণিয়ার মাটিতে।

গ্রন্থাবলী

  • জাগরী ১৯৪৫
  • চিত্রগুপ্তের ফাইল ১৯৪৯
  • ঢোঁড়াইচরিত মানস (প্রথম চরণ) ১৯৪৯
  • ঢোঁড়াইচরিত মানস (দ্বিতীয় চরণ) ১৯৫১
  • গণনায়ক, ১৯৪৮ (গল্পগ্রন্থ)
  • সত্যি ভ্রমণ কাহিনি ১৯৫১ছোটগল্প
  • অচিন রাগিনী ১৯৫৪ছোটগল্প
  • অপরিচিতা ১৯৫৪ছোটগল্প
  • সংকট ১৯৫৭উপন্যাস
  • আলোক দৃষ্টি ১৯৬৪ছোটগল্প
  • অপরিচিতা ১৯৫৪ছোটগল্প
  • চকাচকি ১৯৫৬ছোটগল্প
  • পত্রলেখার বাবা ১৯৫৯ছোটগল্প
  • জলভ্রমি ১৯৬২ছোটগল্প
  • দিকভ্রান্ত ১৯৬৬,-উপন্যাস মৃত্যুর পর প্রকাশিত
  • ডাকাতের মা

উপন্যাসসমূহ

জাগরী

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম সাড়া জাগানো উপন্যাস। প্রকাশকাল ১৯৪৫ ; গ্রন্থটি সতীনাথ ভাদুড়ীর প্রথম প্রকাশিত হলেও কোথাও প্রথম প্রচেষ্টার সামান্যতম জড়তার চিহ্নমাত্র নেই। একেবারে ওস্তাদ লিখিয়ের মত সর্বত্র পরিণতির ছাপ। উপন্যাসের বিষয়বস্তু পূর্ণিয়া প্রবাসী একটি বাঙালি পরিবার কেন্দ্রিক; বাবা,মা, দুই ছেলেডাকনাম বিলু নীলু। বাবা ছিলেন ওখানকারই একটি স্কুলের হেডমাস্টার,বিদ্যা ব্যক্তিত্বের জোরে সকলের কাছেই সম্মানিতসকলের মাস্টারসাহেব। গান্ধিবাদী আন্দোলনের প্রতি প্রবল আস্থাতে চাকুরি ছেড়ে সেখানেই আশ্রম খুললেন। আশ্রমই হলো কংগ্রেসের অফিস। খাওয়াদাওয়া, কাজকর্ম,সবই চলতে থাকলো মহাত্মার আশ্রমের অনুকরণে। মা আশ্রমের গৃহস্থালীর দায়িত্ব সামলাতে থাকলেন। বিলু, নীলু আশ্রমেই বড়ো হলো। বড়ো ছেলে বিলু ম্যাট্রিক পাশ করলো কিন্তু আশ্রমের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাকে আর কলেজে পড়ানো চলল না। কাশী বিদ্যাপীঠে পড়ে সে শাস্ত্রী উপাধি পেল। ছোটো ছেলে নীলু কলেজে পড়েই পাশ করলো।

দুইভাই গান্ধিবাদের পথে আশ্রম থেকে কংগ্রেসের স্বার্থে কাজ করতে থাকে; মাঝে মাঝে জেলও খাটতে থাকে। যেমন তাদের বাবা খাটেন। ক্রমে কাজ পথের উপর দুভাইয়ের সংশয় বিরাগ তৈরি হলযোগ দিল কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টিতে। নতুন উদ্যমে পার্টিতে দুভাই কাজ করতে লাগলো। তারপর যথা নিয়মে আবারও জেল। এই জেলের মধ্যেচন্দ্রদেও‘-এর সাথে পরিচয়; তার লেকচার অকাট্য যুক্তিতে উদ্বুদ্ধ য়ে ছোটভাই নীলু কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি ছেড়ে যোগ দিল কম্যুনিস্ট দলে। তখন ১৯৪২ এর আগস্ট আন্দোলন। সরকারী হুকুমে আশ্রম কংগ্রেস অফিসজপতোহলো। বাবামা দুজনেই জেলে সিকিউরিটি বন্দী। আগস্ট আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে বিচারে বড়ো ভাই বিলুর ফাঁসির হুকুম হলো। রাত পোহালেই বিলুর ফাঁসি, তাই তাকে কঠোর নিরাপত্তায় রাখা হয়ে ফাঁসি সেলে। একই জেলের আপার ডিভিশন সেলে বন্দী পিতা মাস্টারসাহেব আর মহিলা সেলে তীব্র উৎকণ্ঠায় মা বন্দী জীবন অতিবাহিত রে চলেছেন। কী অভূতপূর্ব মানসিক দ্বন্দ্বের রুদ্ধশ্বাস আবহ পাঠককে রোমাঞ্চিত করে। এদিকে ছোটোভাই কম্যুনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে দাদার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। আর সৎকারের জন্য ছোটোভাই নীলু দাদার দেহ নিতে অপেক্ষা করতে থাকে জেলগেটে।

 

 

সতীনাথ ভাদুড়ী

 

জন্ম

২৭ সেপ্টেম্বর ১৯০৬

ভাট্টাবাজারপূর্ণিয়াবিহারব্রিটিশ ভারত

মৃত্যু

৩০ মার্চ ১৯৬৫

জাতীয়তা

ভারতীয়

নাগরিকত্ব

ভারত 

পরিচিতির কারণ

সাহিত্যিক

Satinath Bhaduri – সতীনাথ ভাদুড়ী ।

এখানে আছে ০৩টি বই ।
০৩টি বই এর তালিকা নিচে দেয়া হলো :

সূচিপত্র
১.জাগরী ।
২.ঢোঁড়াই চরিত মানস ।
৩.সতীনাথ ভাদুড়ীর নির্বাচিত রচনা ।

“এক অ্যাপে সকল বই”
সতীনাথ ভাদুড়ীর অ্যাপটি
ডাউনলোড করুন

error: Content is protected !!